সিএসইতে কেন পড়ব?

এই লেখাটা লেখব প্রতিবছরই ভাবি। সেই আদিম যুগ থেকে দেখে আসছি উদ্ভাসের পেজে একটা গল্প আছে সিএসই নিয়ে। সেখানে এক ভাইয়ের গল্প আছে যিনি ক্লাস করতেন না তারপর বড় এক কোম্পানিতে জব পেয়েছিলেন। প্রতিবছর এডমিশন আসলেই সেই পোস্টটাই বারবার সবাই পড়ে আর মোটিভেটেড হয়। গল্পটা আসলে অনেক পুরাতন। ওইটা সিএসই লাইফের একটা অংশ মাত্র। লেখাটা সাইজে একটু বড় হবে। এই লেখার প্রথমে থাকবে সিএসই তে কেন পড়ব? পরের অংশে থাকবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসইতে কেন পড়ব?
আমরা যখন কোন জিনিশ নিয়ে কথা বলি বা আলোচনা করি বা আমরা কোন কিছুর সাথে কোন কোন কিছুর কম্পেয়ার করি আমরা একটা বড় ভুল করি। আমরা বিষয়টাকে একটা পার্সপেকটিভ থেকে দেখি ও মতামত দিয়ে দেই। একটা কিউবের ঠিক যেরকম ছয়টা তল থাকে পৃথিবীর প্রত্যেকটা বিষয়েরই অনেক গুলো তল থাকে। অনেক বিষয়ের অনেক ডিপেন্ডেন্সি থাকে।আমরা এক্সট্রিম কন্ডিশনে না পড়লে সেগুলোকে চোখে দেখতে পারি না।এজন্য মাঝেমধ্যেই আমরা হতাশ হই।
ঠিক সেরকম একটা বিষয় আমাদের এই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ব্যাপারটার মধ্যে আছে। স্কুল কলেজে থাকতে একজন শিক্ষার্থীকে ঠিক করতে হয় সে জীবনে কি করবে? তার সামনে সাধারণত দুইটা পথ খোলা থাকে। এক ডাক্তারি দুই ইঞ্জিনিয়ারিং। এর বাইরে না পারে সে তার ফ্যামিলি আর সমাজকে তার প্যাশনের ক্ষেত্রটা বোঝাতে। না নিজেকে বুঝতে। না প্যাশনকে চিনতে। না লাইফ কে বুঝতে। কতইবা বয়স তার? তার জ্ঞানের মাত্রা ওই ফিজিক্স বইয়ের শেষ চ্যাপ্টারের ট্রাঞ্জিস্টর কে সুইচ আর এমপ্লিফায়ার হিসাবে ব্যাবহার করা যায় আর ওই ডায়াগ্রামটা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তুমি কি এগুলো কোনদিন দেখেছো আমার বিশ্বাস একশ জনে নিরানব্বই জনই আকাশ থেকে পড়বে। এই সমস্যা সেই শিক্ষার্থীর নয়। এই সমস্যা আমাদের সিস্টেমের। যে সিস্টেমে আমরা ছোট থেকে বড় হচ্ছি। আমরা ইংরেজি শেখা থেকে প্যারাগ্রাফ মুখস্ত করতে বেশি ভালোবাসি। এজন্য আমরা গুগোল সার্চ দিয়ে একটা ইংরেজি ব্লগ থেকে পড়াগুলো বুঝতে ভয় পাই। সিস্টেম আমাদের পড়ালেখাকে আনন্দ থেকে সার্টিফিকেট, মার্ক্স, গ্রেড এসবের দিকে বেশি লক্ষ্য দিতে শেখায়। আমরা পড়ার আনন্দের থেকে নাম্বারের পেছনে ছুটি। একটা থিওরি কিভাবে কাজ করে এইটা হয়ত বইতে নাই বা এক্সামে আসবে না বলে আমরা পড়ি না বা শিক্ষকেরাও পড়ান না।
ভার্সিটির শিক্ষাব্যাবস্থাটা আবার একটু অন্যরকম। এই হতাশার গল্পটা একটু কম এই যায়গায় এসে। এখানে আসলেই একটু পড়াশোনা হয়। আবার স্বাধীনতাটাও পাওয়া যায়। কিন্ত সমস্যাটা বাধে অন্য যায়গায়। এই লেখাটা ঠিক যে কারন নিয়ে লেখা।
ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে আমরা কি বুঝি? একজন ইঞ্জিনিয়ার আর একজন সায়েন্টিস্টের মধ্যে পার্থক্য কি?
এই প্রশ্নটা আমি আমার লাইফে দেখা প্রত্যেকটা জুনিয়রকে পরিচয়ের দিনেই করি। অধিকাংশই উত্তরটা দিতে পারেনা। আমাকেও একদিন একবড় ভাই এ প্রশ্নটা করেছিলেন।আমিও ঠিক ভালোমত উত্তরটা দিতে পারিনি।শুনে অবাক হচ্ছেন নিশ্চই। ওইযে বললাম সিস্টেম।
সহজ ভাষায় বললে ইঞ্জিনিয়ারিং হচ্ছে আমরা যা থিওরিতে পড়ি সেইটাকে ইমপ্লিমেন্ট নিয়ে কাজ করা। একজন সায়েন্টিস্ট একটা বিষয়ের একদম বেসিক কনসেপ্ট গুলো নিয়ে কাজ করে। আমরা যেটাকে থিওরি বলি সেটাকে তৈরী করে। আর ইঞ্জিনিয়ারেরা রিয়াল লাইফ এস্পেক্টস নিয়ে কাজ করে।সেই থিওরি গুলোকে রিয়াল লাইফে ইমপ্লিমেন্ট করতে গেলে কি কি করতে হবে? কি কি সমস্যা হবে সেই সমস্যা গুলো কিভাবে ওভারকাম করা যায় এসব নিয়ে কাজ করে।
এই বিষয়টা অনেকেই না বুঝে আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হয়ে যাই। কারন হয়ত পাশের বাসার আন্টির ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে অনেক টাকা ইনকাম করেছে। অথবা বন্ধুরা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। আমি না পড়লে তো আমার ভ্যালু কমে যাবে। সমাজ আমাকে কিভাবে নিবে। এবং আসলেই সমাজ আমাদের জীবনের সবকিছুকেই প্রভাবিত করে। ইঞ্জিনিয়ারিং এ URP বলে একটা সাব্জেক্ট আছে। প্রত্যেকটা ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটিতে ভর্তির চয়েসে একদম শেষ লিস্টে থাকে সবার। অনেকে আবার ভর্তি হলে অনেকে নাক শিটকাবে। এহ এইটা আবার সাবজেক্ট হইলো? কিন্ত ইঞ্জিনিয়ারিং এ এই সাব্জেক্ট গুলোর মধ্যে র‍্যাংকিং কে করে দিয়েছে ভাই। প্রত্যেকটা সাব্জেক্ট স্বতন্ত্র সাব্জেক্ট। প্রত্যেকটা সাব্জেক্টের নিজস্ব এপ্লিকেশন আছে। নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। এবং আমি স্ট্যাম্পে সই করে লিখে দিতে পারো তুমি যদি প্যাশনেট হও আর প্যাশনের পেছনে পরিশ্রম করো তুমি আদিম যুগের গুহার মধ্যে কোন ভার্সিটিতে পড়েও দুনিয়া কাপায় দেয়ার ক্ষমতা রাখো।
এখন আসি সিএসইতে কি কি পড়ানো হয় ?
বাংলাদেশে প্রায় সব ভার্সিটিতে সিএসইর সিলেবাস সেম। সিএসইতে কিভাবে কীবোর্ডে দুইহাতে টাইপ করতে হয়,গ্রামীনফোনের কি কি প্যাকেজ আছে আর আইফোনে কিভাবে গান আপ্লোড করতে হয় এসব শেখানো হয়না। সিএসইতে একদম বেসিক বিষয়গুলো শেখানো হয়। প্রথমত যেটা শেখানো হয় সেটা হচ্ছে একটা প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ। শেখানো হয় আসলে প্রোগ্রামিং বিষয়টা কি? বেসিকটা শিখে নিলে যেকোন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ বা ফ্রেমওয়ার্ক নিজে নিজেই শিখে নেয়া যায়। সিএসইতে শেখানো হয় একটা প্রোগ্রাম কিভাবে একটা কম্পিউটারের মধ্যে কাজ করে। এজন্য অনেকগুলো বেসিক জিনিশ শেখানো হয়। এছাড়াও কম্পিউটার সায়েন্সের একদম বেসিক লেভেলের পড়াশোনা গুলো শেখানো হয়। সাথে কিছু এপ্লিকেশন রিলেটেড কোর্স থাকে। দুই একটা। আমরা অনেক সময় সিএসই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং কে এক করে ফেলি। সিএসই পড়ে চাইলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যায় তাছাড়া অনেক কিছুই হওয়া যায়। আজকাল কিছু ভার্সিটিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং আলাদাভাবে পড়ানো হয়। এই সাবজেক্টেরও নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। তবে সিএসই আর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, আইসিই, ইটিই, মেকাট্রনিক্স এক না। প্রত্যেকটা সাবজেক্টের নিজস্ব মিশন ভিশন আছে।
এখন বলি সিএসই পড়ে লাইফে কি কি করা যায়?
এই বিষয়টাকে আমি দুইভাগে ভাগ করব। এক দেশে কি করা যায়। দুই বিদেশে কি করা যায়?
প্রথমে বলি দেশে কি করা যায়? আমাদের দেশে অনেক সফটওয়্যার কোম্পানি আছে। সিএসই পড়ে সেসব কোম্পানিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে জব করা যেতে পারে। এছাড়াও মোবাইল কোম্পানি গুলো আছে সেখানে কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে জব পাওয়া যায়। তবে শুনেছি রিসেন্টলি এই জব গুলো কম। এছাড়াও যেকোন আইএসপিতে নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে জব পাওয়া যেতে পারে। ভার্সিটি আসলে আমাদের শেখায় কিভাবে কোন কিছু শিখতে হয়। এজন্য সিএসইতে পড়লে নিজেকে একটা প্যাশনের সেক্টর খুজে বের করে নিতে হবে। তারপর সেটার পেছনে লেগে থাকতে হবে। সেটা হতে পারে গেম ডেভলপমেন্ট, হতে পারে এপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট, হতে পারে এআই বা মেশিন লার্নিং, হতে পারে রোবোটিক্স বা অন্যকিছু। পাথ সিলেক্ট করে লেগে থাকাটা হচ্ছে মাস্ট। এছাড়াও সিএসই পড়ে ফ্রিল্যান্সার হওয়া যায়। ভালোমত ফ্রিল্যান্সিং প্রোফাইল তৈরী করতে পারলে অনেক সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ পাওয়া যায়। সেদিন একটা ব্লগে পড়ছিলাম টপ ফ্রিল্যান্সিং সাবজেক্টের মধ্যে একটা দেখলাম হার্ডওয়ার প্রোটোটাইপিং ( মানে আমরা এই যে আরডুইনো দিয়ে যেকোন আইডিয়াকে ইমপ্লিমেন্ট করি এরকম) ।
বাংলাদেশে এখন একটা চেঞ্জ আসতে শুরু করেছে। অনেকেই জব বাদ দিয়ে স্টার্টাপ, নিজের কিছু একটা করার চিন্তা করছে। সিএসই পড়ে এই কাজ করার অনেক সুযোগ। আমরা বলি দেশে অনেক সমস্যা। তাহলে টেকনোলজি দিয়ে সমস্যা সমাধানের জন্য এই দেশে এখন তোমার অনেক সুযোগ।
একটা কথা প্রায়ই শুনি সিএসই পড়ে জব পাবো তো? দেশে ভালো টেকনোলজি জানা লোকের প্রচুর অভাব। সবাই ই সিএসই পড়ে কিন্ত কয়জন টেকনোলজি নিয়ে থাকে? তুমি যদি নিজেকে ঠিকমত তৈরী করতে পারো তোমার জবের অভাব হবে না।
এবার আসব সিএসই পড়ে বিদেশে কি করা যায়। তোমার যদি বাইরের দেশে যাওয়া টার্গেট হয়ে থাকে তাহলে তোমাকে তৈরী করতে হবে। ইঞ্জিনিয়ারদের GRE পরীক্ষা দিয়ে বাইরের ভার্সিটিতে মাস্টার্স/ পিএইচডি করতে যেতে হয়। পাশাপাশি ওদের সাথে কমিউনিকেশন ঠিক রাখতে হয়। বাইরের দেশে রিসার্চের অনেক সুযোগ। কাজ করারও অনেক সুযোগ।জব পাওয়াও সহজ। তবে তোমাকে এইটা ছাত্র বয়সে ঠিক করতে হবে দেশে থাকবা না বাইরে যাবা। সেভাবে নিজেকে তৈরী করতে হবে।
এবার আসি কিছু বেসিক বিষয়ে। এসব বিষয় আমাদের স্কুল কলেজে শেখানো হয়না। হয়ত বা কিছুটা শেখানো হয় কিন্ত বলে দেয়া হয়না এইটা আসলে কি জিনিশ? এই বর্তমান পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে তোমাকে স্মার্ট হতে হবে। তোমার মধ্যে লিডারশীপ, কমিউনিকেশন, টিমওয়ার্ক, ফ্লেক্সিবিলিটি এই স্কিল গুলো থাকতে হবে। নাহলে টিকে থাকা খুব কঠিন। তবে খুশির বিষয় হচ্ছে এই স্কিলগুলো অর্জন করা যায়। তুমি চেষ্টা করলেই পারবা।
এখন লিখব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসইতে কেন পড়ব?
আমাদের এখানে যারা ভর্তি হয় তারা স্বাভাবিকভাবেই কোন ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটিতে হয়ত পছন্দসই সাব্জেক্ট পায়নি বা বুয়েটে এক্সাম দিতেই পারেনি অধিকাংশই এরকম। তবে তারা যে স্টুডেন্ট খারাপ তা না। আমাদের দেশে প্রচুর প্রতিযোগীতা। এবং আমাদের দেশের ছেলেরা আসলেই অনেক ট্যালেন্টেড। এখানে ভর্তি হওয়ার আহামরি কোন কারন নাই। তুমি বুয়েটে চান্স পাইয়া আমাদের এখানে ভর্তি হবা না।সেটা আমি লিখলেও হবা না। না লিখলেও হবা না।
আচ্ছা ধরে নিলাম ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটে তুমি এখানে চান্স পেয়েছ। এখন আমি বলব তোমার সিএসইতে আসা উচিত। কারন আমরা সিএসই একটা ফ্যামিলি। এখানে প্রতি ব্যাচে সিট ৫০ টা। আমরা খুব বেশি মেম্বার না। তবে আমরা সবসময় ফ্যামিলির মত থাকি এখানে। এখানে র‍্যাগিং বলে কিছু নাই। সিনিয়র জুনিয়র আমরা অনেক আপন একে অন্যের সাথে।আমাদের স্যারেরা অনেক ফ্রেন্ডলি। অনেক ভালো।তুমি কারো কাছে হেল্প চাইলে না পাওয়ার চান্স কম এখানে।
উপরের যে লাইনগুলো লিখেছি এই লাইনগুলো শুনে হয়ত তোমার আকর্ষন আমি ধরতে পারিনি। তবে নিচের লাইন গুলো দিয়ে পারব।আমি জানি। এইটা এক্সপেরিয়েন্স থেকে লিখছি।
আমাদের প্রত্যেকটা ক্লাসরুমে এসি আছে। আমাদের প্রত্যেকটা ল্যাবে ডেল এর বিল্টইন পিসি আছে। আমাদের ল্যাবগুলা অনেক সুন্দর। আমাদের সুন্দর একটা সেমিনার লাইব্রেরি আছে। মিনিস্ট্রি অফ আইসিটি থেকে করা আমাদের এক কোটি টাকা ফান্ডের একটা নেটওয়ার্ক ল্যাব আছে। এছাড়াও আমাদের অনেক গুলো ল্যাব আছে। আমাদের ছাত্রদের জন্য ইনকিউবেটর আছে। রিসেন্টলি একটা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ল্যাব চালু হয়েছে। যদিও এইটা ভার্সিটির ল্যাব। তবে সিএসইদের সুযোগ বেশি। আর কয়েকদিন আগেই মোবাইল ডেভেলপমেন্ট ল্যাব বানানো শেষ হলো।
এখন কথা হচ্ছে তুমি কিভাবে এই রিসোর্স গুলো ব্যবহার করে নিজের উন্নতি ঘটাবা এইটা তোমার উপর নির্ভর করে। তোমার বাসায় ইন্টারনেট আছে হাতের কাছে গুগোল আছে কিন্ত প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের কার্নেলের আপডেট করতে পারলা না। তোমার মত দূর্ভাগা কেউ নাই।
যাহোক। তোমার জন্য শুভকামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *